চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমার কারণ কি?

বাংলাদেশে অধিকাংশ চিংড়ি ঘেরে/পুকুরে চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমা-জনিত সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এই সমস্যাটি প্রধানত সনাতন ও উন্নত সনাতন পদ্ধতির ঘের গুলিতে বেশি দেখা দেয় কারন চিংড়ি খামারিরা চাষের শুরু এবং চাষকালীন সময়ে মাটি ও পানির আদর্শ গুনাগুন এবং চিংড়ির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদাসীন থাকেন।

causes-of-external-fouling-on-shrimp-shell

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে যেমনঃ খোলস পরিবর্তনে সমস্যা, চিংড়ির ফুলকায় এই শ্যাওলা জমলে চিংড়ি শ্বাস কষ্টে ভোগে (পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মারাও যেতে পারে), স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, বিভিন্ন ক্ষতিকর অণুজীব কর্তৃক সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, চিংড়ির ধকল বৃদ্ধি পায়, খোলস না পাল্টাতে পারার কারণে মৃত্যু, চিংড়ির বাজার মূল্য অস্বাভাবিক হারে কমে যায় ইত্যাদি।

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমার কারণ

১) পানিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থের উপস্থিতি (যা মূলত অতিরিক্ত খাদ্য খাওয়ানো, অপচয় হওয়া খাদ্যের উচ্ছিষ্ট অংশের তলদেশে জমা হওয়া ও পরবর্তীতে চলমান পচনক্রিয়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ থেকে সৃষ্ট ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ব্লুম)

২) চিংড়িকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণে খাদ্য খাওয়ানো হলে, তা স্বাভাবিকভাবেই অপচয় হয়। ফলে, খাদ্যের উচ্ছিষ্ট অংশ ঘেরের/পুকুরের তলদেশে জমা হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অণুজীব কর্তৃক সঙ্ঘটিত পচনক্রিয়ার মাধ্যমে পানিতে উচ্চমাত্রার অ্যামোনিয়া গ্যাসের সৃষ্টি হয়। যেহেতু, পানিতে এই অ্যামোনিয়া মূলত দুইটি ফরমে থাকে – একটি হল তুলনামূলক কম ক্ষতিকর অ্যামোনিয়াম আয়ন হিসেবে এবং অন্যটি হচ্ছে অত্যন্ত ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস হিসেবে। এই ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস, চিংড়ির ফুলকা ক্ষয় করে, ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয় এবং চলন শক্তিকে স্তিমিত করে ফেলে, ফলে চিংড়ির খোলসের উপর শ্যাওলা স্থির হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

৩) পুকুর বা ঘেরের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (DO) লেভেল কমে যাওয়া।

৪) পানিতে মিনারেলসের অভাব, বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের অনুপাত সঠিক না থাকার কারণে চিংড়ির খোলস পরিবর্তন না করা।

যে প্রক্রিয়ায় খোলসে শ্যাওলা জমে

উপর্যুক্ত পরিস্থিতে,

  • ঘের/পুকুরের পানিতে ‘পেরিট্রিকাস সিলিয়েট’ নামক একজাতীয় ক্ষুদ্র পরজীবীর(যেমন: জ্যুথামনিয়াম, এপিস্টাইলিস, ভর্টিসেলা ইত্যাদি) আধিক্য বেড়ে যায়। এরা চিংড়ির খোলসকে তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে।
  • বিভিন্ন প্রজাতির ফিলামেন্টাস ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে Leucothrix mucor ব্যাকটেরিয়াটি চিংড়ির খোলস ও ফুলকায় আটকে যায়।
  • সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ-সবুজ শৈবাল) এবং নির্দিষ্ট কিছু সবুজ ফিলামেন্টাস শৈবালও চিংড়ির খোলসে এই ধরনের লোমশ আবরণ তৈরি করে।
প্রদীপ কুমার দাম
প্রদীপ কুমার দাম

মৎস্যবিদ প্রদীপ কুমার দাম, একজন একুয়াকালচার এক্সপার্ট। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন থেকে ফিসারিজ বিষয়ে বিএসসি (সম্মান) এবং ফিস জেনেটিক্স এন্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার প্রায় ১২ বছরের অধিক সময় ধরে মৎস্য সেক্টরের বিভিন্ন পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক/সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার পদে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ এ কর্মরত আছেন।