হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) বিশ্বব্যাপী বাগদা চিংড়ি চাষের অন্যতম ধ্বংসাত্মক অনুজীব হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালে তাইওয়ানে সর্বপ্রথম এই সংক্রামক ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে এই ভাইরাসটি দ্রুত এশিয়া এবং পরবর্তীতে আমেরিকা, ইউরোপ ও ওশেনিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বাগদা চিংড়ির খামার পর্যায়ে ব্যপক ধস এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

এটি মূলত penaeid জাতীয় চিংড়ি যেমন: Litopenaeus vannamei (ভেনামি চিংড়ি), Penaeus monodon (বাগদা চিংড়ি) এবং Marsupenaeus japonicus কে আক্রান্ত করে। তবে এটি কাঁকড়া এবং মিঠা পানির গলদা চিংড়িসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রাস্টাসিয়ান (crustaceans) প্রাণীকেও সংক্রমিত করতে পারে। WSSV ভাইরাসটি Nimaviridae পরিবারের Whispovirus গণের অন্তর্ভুক্ত।
বাগদা চিংড়ি যেকোন বয়সেই হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিএল থেকে জ্যুভেনাইল স্টেজে সংক্রমনের হার বেশি ঘটে থাকে। সাধারনত, চাষ শুরুর ১৫-৫০ দিনের মধ্যে এই ভাইরাসের আক্রমন শুরু হয়ে থাকে।
হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) সংক্রমনের লক্ষন
- হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) দ্বারা আক্রান্ত বাগদা চিংড়ির বহিঃকঙ্কালে, বিশেষ করে ক্যারাপেস (মাথার খোলস), উপাঙ্গ এবং খোলসের বিভিন্ন অংশে বৃত্তাকার, সাদা দাগ বা ফলক (০.৫–৩ মিমি ব্যাস) দেখা যায়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এই দাগগুলো মূলত ক্যালসিয়াম জমা হওয়ার ফলে তৈরি হয় যা কিউটিকুলার এপিথেলিয়াম টিস্যুতে এই ভাইরাসের সংক্রমণের সাথে সম্পর্কিত।
- তবে এই ধরনের সাদা দাগ দেখা দিলেই যে চিংড়ি সবসময় WSSV তে আক্রান্ত হয়েছে, এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিছু প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে, এই দাগগুলো অনুপস্থিতও থাকতে পারে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, পুকুর/ঘেরের পানি ও মাটির পরিবেশ খারাপ হওয়া ও পরিবেশগত চাপের কারণেও অনুরূপ দাগ দেখা দিতে পারে।
- আক্রান্ত বাগদা চিংড়ি সাধারনত দূর্বল হয়ে পড়ে ও এদের চলাচলের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে প্রায়শই চিংড়ি পুকুর/ঘেরের পাড়ের কাছাকাছি অথবা পানির উপরিভাগে দূর্বলভাবে সাঁতার থাকে। মড়ক শুরু হবার আগে এরা অস্বাভাবিকভাবে (যেমন: কাত হয়ে বা এলোমেলোভাবে) সাঁতার অথবা চলাফেরা করতে শুরু করে।
- WSSV দ্বারা সংক্রমিত চিংড়ির ক্ষুধামন্দা দেখা যায় এবং চিংড়িটিকে সূর্যের আলোর বিপরীতে ধরলে দেখা যাবে যে, চিংড়ির পিঠের উপরিভাগ দিয়ে অতিক্রম করা খাদ্য নালীটি ফাঁকা। একারনে চিংড়ি ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পড়ে।
- ক্রোমাটোফোর (chromatophore) সম্প্রসারণ বা হিমোলিম্ফের পরিবর্তনের কারণে চিংড়ির শরীর এবং উপাঙ্গে লালচে বা গোলাপি আভা দেখা দেয়। গুরুতর সংক্রমনের ক্ষেত্রে হেপাটোপ্যানক্রিয়াস (hepatopancreas) ফ্যাকাশে বা সাদাটে রঙের এবং আকারে বড় দেখায়।
উপরের লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার প্রথম ১-২ দিনের মধ্যেই সাধারনত বাগদা চিংড়ির মৃত্যু/মড়ক শুরু হতে পারে এবং হোয়া্ইট স্পট ভাইরাসের জন্য অনুকূল পরিবেশে (পানির তাপমাত্রা ১৮-৩০° সেলসিয়াস) ৩-১০ দিনের মধ্যে ৮০-১০০ শতাংশ চিংড়ি মারা যেতে পারে। ভাইরাস বহনকারী চিংড়িতে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা নাও যেতে পারে। পুকুর বা ঘেরের পানির পরিবেশগত চাপ বাড়ার সাথে সাথে এর প্রকোপ বাড়তে থাকে।
WSSV তে আক্রান্ত বাগদা চিংড়ির টিস্যু পরীক্ষায় (Histopathology) দেখা যায় যে, আক্রান্ত কোষের নিউক্লিয়াস অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে এবং কিউটিকুলার এপিথেলিয়াম ও কানেক্টিভ টিস্যুর মতো লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ব্যাপক কোষক্ষয় (necrosis) ঘটেছে।




