বাগদা চিংড়িতে হোয়াইট স্পট সিনড্রম ভাইরাস কিভাবে সংক্রমিত হয়?

বাংলাদেশে বাগদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে ‘হোয়াইট স্পট’ বা “সাদা দাগ” রোগ একটি নিরবচ্ছিন্ন হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। এর আকস্মিক প্রাদুর্ভাব মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ঘের/পুকুরের বাগদা চিংড়ি উজাড় করে দিতে পারে, যা খামারিদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এই ভাইরাস বারবার উৎপাদন চক্রকে ব্যাহত করছে। 

wssv

বিশ্বজুড়ে বাগদা চিংড়ি চাষে WSSV অন্যতম ধ্বংসাত্মক প্যাথোজেন হিসেবে পরিচিত। এই সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় যে, এই সংক্রমণ মূলত তিনটি আন্তঃসংযুক্ত পথ থেকে সৃষ্টি হয়: WSSV দ্বারা সংক্রমিত পোনা, ঘেরের পরিবেশগত (মাটি ও পানির প্যারামিটারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন) সমস্যা এবং ত্রুটিযুক্ত খামার ব্যবস্থাপনা।

প্রজননক্ষম চিংড়ি ও পিএল থেকে সংক্রমণ

বাগদা চিংড়ির খামারে WSSV প্রবেশের অন্যতম প্রাথমিক পথ হলো উল্লম্ব সংক্রমণ (Vertical Transmission), যা প্রজননক্ষম মা চিংড়ি থেকে পিএল এর দেহে সংক্রমিত হয়। থাইল্যান্ডে Penaeus monodon (বাগদা চিংড়ি) – এর ওপর পরিচালিত গবেষণায় মা চিংড়ি এবং পোনার মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতির একটি নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক ধরন দেখা গেছে ও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে WSSV-পজিটিভ নমুনার উচ্চ হার লক্ষ্য করা গিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মা চিংড়িও ভাইরাস বহন করতে পারে এবং তা পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে পারে।

এই উল্লম্ব পথটি বিশেষ করে সেই সব হ্যাচারির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যারা প্রাকৃতিক অথবা ঝুকিপূর্ণ উৎস থেকে মা বাগদা চিংড়ি সংগ্রহ করে। WSSV সংক্রমিত পিএল যখন চাষের ঘের/পুকুরে ছাড়া হয়, তখন সেটিই সংক্রমণের প্রাথমিক উৎস হিসেবে কাজ করে। ফলে চাষ চক্রের শুরুতেই WSSV ভাইরাস তার আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।

ঘের/পুকুরে আনুভূমিক সংক্রমণের পথসমূহ

WSSV একবার বাগদা চিংড়ি খামারে প্রবেশ করার পর, আনুভূমিক প্রক্রিয়ায় (Horizontal Transmission) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পানির সংস্পর্শ, ভাইরাসযুক্ত খাবার বা সরঞ্জাম, ভাইরাস বহনকারী অন্যান্য প্রাণীর (যেমন: বিভিন্ন প্রজাতির ছোট চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি) উপস্থিতি এবং অসুস্থ চিংড়িকে অন্য সুস্থ চিংড়ির খেয়ে ফেলার (Cannibalism) মাধ্যমে এই সংক্রমন দ্রুত  বিস্তার লাভ করে। এছাড়াও চিংড়ির মুখের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে ঢুকলে তা প্রথমে পাকস্থলী এবং ফুলকার কোষে বংশবৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীতে সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পুকুর/ঘেরের পানি বা লালার মাধ্যমে এই ‍ভাইরাস ঘের/পুকুরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ পানিই এখানে সংক্রমণের প্রধান মাধ্যম হিসাবে কাজ করে।

যেসব বাগদা চিংড়ির খামার খাল বা নদী থেকে সরাসরি ঘেরে পানি উত্তোলন হয়, সেখানে ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে যদি পার্শ্ববর্তী কোনো খামারে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, আর সেই খামারের মৃত চিংড়ি যদি পার্শ্ববর্তী খাল বা নদীতে ফেলা হয়, তাহলেও WSSV সংক্রমন হতে পারে। উন্নত-সনাতন (Improved Extensive) চাষ পদ্ধতি যেখানে প্রাকৃতিক উৎসের পানির ওপর নির্ভরশীলতা বেশি থাকে এবং জৈব নিরাপত্তা (Biosecurity) খুবই কম থাকে, সেখানে উল্লম্ব ও আনুভূমিক উভয় এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি খুবই বেশি থাকে। অন্যদিকে, আধানিবিড় চাষ (Semi-intensive) অথবা নিবিড় চাষ (intensive) পদ্ধতি,  যেখানে চিংড়ির ঘনত্ব বেশি থাকে, সেখানে এই সংক্রমণ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, হোয়াইট ‍স্পট সিনড্রম ভাইরাস (WSSV) দ্বারা বাগদা চিংড়ির সংক্রমিত হবার বেশ কয়েকটি কারন থাকলেও, চূড়ান্তভাবে এই ভাইরাস তখনই বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে যখন বাগদা চিংড়ির পিএল সংক্রমিত থাকে, ঘেরের/পুকুরের জৈব নিরাপত্তা দূর্বল থাকে, পানির উৎস্য অনিরাপদ হয়, ঘের/পুকুরে ভাইরাসের বিভিন্ন বাহক যেমন: ছোট চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদির ব্যাপক উপস্থিতি, পানি ও মাটির আদর্শ প্যারামিটারসমূহের তারতম্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

প্রদীপ কুমার দাম
প্রদীপ কুমার দাম

মৎস্যবিদ প্রদীপ কুমার দাম, একজন একুয়াকালচার এক্সপার্ট। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন থেকে ফিসারিজ বিষয়ে বিএসসি (সম্মান) এবং ফিস জেনেটিক্স এন্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার প্রায় ১২ বছরের অধিক সময় ধরে মৎস্য সেক্টরের বিভিন্ন পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক/সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার পদে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ এ কর্মরত আছেন।