বাগদা চিংড়ি WSSV আক্রান্ত হলে কি করনীয়?

হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ যা সাধারণত বাগদা ও ভেনামি চিংড়িকে আক্রমণ করে ব্যাপক মড়ক সৃষ্টি করে।হোয়াইট স্পট রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৩-১০ দিনের মধ্যে এতে ১০০% পর্যন্ত মৃত্যুহার হতে পারে, যা বাগদা ও ভেনামি চিংড়ি চাষে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ আমরা শুধুমাত্র আলোচনা করবো যে, বাগদা চিংড়ি হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) এ আক্রান্ত হলে একজন চিংড়ি খামারির ঠিক কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ?

wssv comp

বাগদা চিংড়িতে WSSV-এর প্রধান লক্ষণসমূহঃ

সাদা দাগ: বাগদা চিংড়ির মাথার খোলস (carapace), লেজ ও এপিডার্মিসের ভেতরে ০.৫–৩ মিমি ব্যাসের সাদা দাগ দেখা যায় (এগুলো মূলত ক্যালসিয়াম জমা হওয়ার ফলে হয়; তবে এই দাগ সবসময় নাও থাকতে পারে এবং উচ্চ ক্ষারত্ব বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে)।

দেহের রঙ পরিবর্তন: মূলত ইনফ্লামেশনের কারণে ক্রোমাটোফোর (chromatophore) এর অধিক বিস্তারের ফলে শরীর লালচে বা গোলাপি রঙের দেখায়।

আচরণগত পরিবর্তন: বাগদা চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়া কমিয়ে দেয় অথবা একেবারে বন্ধ করে দেয় এবং অস্বাভাবিকভাবে সাঁতার কাটে (যেমন: পানির উপরিভাগে, কাত হয়ে বা পুকুরের পাড়ে চলে আসা ইত্যাদি)।

আলগা খোলস: চিংড়ির খোলস খোলস ঢিলে হয়ে যায় এবং সহজেই শরীর থেকে আলাদা হয়ে আসে।

অন্যান্য লক্ষণ: খাদ্যনালী খালি থাকা এবং ফুলকা (gill) নষ্ট হয়ে যাওয়া।

দ্রুত মড়ক: খুব অল্প সময়ে ব্যাপক মড়ক দেখা দেয়, এমনকি তীব্র সংক্রমণের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাদা দাগ স্পষ্ট হওয়ার আগেই চিংড়ি মারা যেতে পারে।

প্রতিকার বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাঃ

WSSV একটি ভাইরাস যার বিপরীতে কোন এন্টি-ভাইরাল ড্রাগ অথবা কোন ভ্যাকসিন এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ঘের বা পুকুরে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তা পুরোপুরি নিরাময় করতে পারে এমন কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। ল্যাবরেটরিতে কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতি (যেমন: RNA interference/siRNA বা VP28 প্রোটিন লক্ষ্য করে তৈরি DNA/RNA ভ্যাকসিন) আশা জাগালেও সেগুলো এখনো খামার পর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী নয়। সুতরাং, আপনার ঘেরে বা পুকুরের বাগদা চিংড়ি একবার এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে এর কোন প্রতিকার বা চিকিৎসা নেই যা আপনার মজুদকৃত চিংড়িকে বাঁচাতে পারবে।

WSSV সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক করণীয়ঃ

রোগ নিশ্চিত করুন

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, আপনার বাগদা চিংড়ি হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) আক্রান্ত কি না সেটা কিন্তু শুধু একটি বা দু’টি লক্ষণ দেখেই নিশ্চিত করা উচিৎ নয়। সংক্রমন শুরুর প্রথম পর্যায়ে অথবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিংড়ির খোলসে কোন সাদা দাগ দেখা যায় না এবং উপরের লক্ষণগুলির মধ্যে মাত্র ১-২ টি লক্ষণ দেখা যায় অথচ কয়েকদিনের মধ্যে ব্যাপকহারে মড়ক দেখা যায়। এ থেকে বোঝা যায় যে ঐ বাগদা চিংড়ি আসলে ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছিলো। একারণে, শতভাগ নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য অসুস্থ চিংড়ি কাছাকাছি একটি মানসম্পন্ন ল্যাবে PCR পরীক্ষার জন্য পাঠান। শুধু সাদা দাগ দেখে নিশ্চিত হবেন না কারণ অনেক সময় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন অথবা খোলসের নিচে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমা হবার কারণেও হতে পারে।

আক্রান্ত চিংড়িকে আলাদা ও অপসারণ করা

  • ভাইরাস আপনার অন্য ঘের বা পুকুরে ছড়ানো রোধ করতে অবিলম্বে পানি পরিবর্তন বা বিনিময় বন্ধ করুন।
  • সংক্রমণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, চিংড়ির ধকল কমাতে খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সম্ভব হলে সয়েল প্রোবায়োটিক ও ভিটামিন সি প্রয়োগ করে পর্যাপ্ত এরেশন এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
  • ভাইরাস সংক্রমণের মাত্রা কমাতে প্রতিদিন মৃত বা মুমূর্ষু চিংড়ি যত দ্রুত সম্ভব ঘের বা পুকুর থেকে সরিয়ে ফেলুন এবং ঘের বা পুকুর থেকে দূরের সুবিধাজনক একটি স্থানে মাটিতে পুঁতে ফেলুন।

চিংড়ি দ্রুত আহরণ করা

  • যদি মড়ক ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে এবং চিংড়ি বাজারজাত করার উপযোগী হয়, তবে সব হারানোর আগেই যত দ্রুত সম্ভব চিংড়ি ধরে ফেলুন।
  • এই অবস্থায় জীবিত অবশিষ্ট বাগদা চিংড়ি এক ঘের বা পুকুর থেকে অন্য ঘের বা পুকুরে স্থানান্তরিত করা যাবে না। কারণ, আপনি যদি এই পরিস্থিতিতে ভাইরাস আক্রান্ত কিন্তু তখন মারা যায়নি এমন চিংড়ি অন্য ঘেরে মজুদ করেন তাহলে সেই ঘের বা পুকুরের বাগদা চিংড়িরও হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস (WSSV) দ্বারা আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
  • যদি চিংড়ি ধরার মত না হয় তাহলে তা বাজারে বিক্রি করার আশা ত্যাগ করাই শ্রেয়।

আক্রান্ত পুকুর জীবাণুমুক্ত করা

  • চিংড়ি আহরণ বা মড়ক শেষ হওয়ার পর ৪০-৫০ পিপিএম হারে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে অবশিষ্ট চিংড়ি ও ভাইরাস ধ্বংস করুন। প্রয়োগের সময় ভালোভাবে বাতাস এরেশন (aeration) ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে এবং ২-৩ দিন এই অবস্থায় রেখে দিতে হবে।
  • আপনার ঘেরে বা পুকুরে ব্যবহৃত সকল সরঞ্জাম যেমনঃ এরেশন মেশিন, ফিডিং/চেক ট্রে, জাল, ফিড দেওয়ার নৌকা(যদি থাকে), ল্যান্ডিং স্পট, পানির পাম্প এবং চিংড়ি পরিবহনের যানবাহন (যদি থাকে) পটাশিয়াম-পার-ম্যাঙ্গানেট অথবা পভিডন আয়োডিন জীবাণুনাশক দ্বারা জীবাণুমুক্ত করুন।
  • যদি ঘের বা পুকুরটিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভাল থাকে অর্থাৎ নিরাপদভাবে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকে এবং সময়টি যদি বর্ষাকালের পূর্বে হয় তাহলে সম্পূর্ণ পানি আউটলেট থেকে বের করে তলদেশ থেকে কমপক্ষে ৬-৮ ইঞ্চি মাটি অপসারণ করতে হবে। এরপর ঘের বা পুকুরটি কমপক্ষে ১৫ দিন শুকিয়ে নিয়ে মাটি চাষ দিয়ে তারপর যতখানি সম্ভব তা সমান করে দিতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে তলদেশে যেন অনেক বেশি ছোট ছোট গর্ত বা পকেট না থাকে। এসব পকেট থাকলে তা খাদ্যের অবশিষ্ট অংশ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ আটকে রেখে সেখানে চিংড়ির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করে যা মুহূর্তেই চিংড়িকে দুর্বল করে ফেলে এমনকি তীব্র অক্সিজেন সংকট ঘটিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে!

পরবর্তী চাষের জন্য ঘের বা পুকুর প্রস্তুত করাঃ

আক্রান্ত ঘের বা পুকুর সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত করা এবং শুকানোর পর পরবর্তী বাগদা চিংড়ির পিএল মজুদ করার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

প্রদীপ কুমার দাম
প্রদীপ কুমার দাম

মৎস্যবিদ প্রদীপ কুমার দাম, একজন একুয়াকালচার এক্সপার্ট। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন থেকে ফিসারিজ বিষয়ে বিএসসি (সম্মান) এবং ফিস জেনেটিক্স এন্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার প্রায় ১২ বছরের অধিক সময় ধরে মৎস্য সেক্টরের বিভিন্ন পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক/সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার পদে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ এ কর্মরত আছেন।