চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমা সমস্যার সমাধান!

বাংলাদেশে চাষকৃত চিংড়ির প্রায় ৯৫% -ই উৎপাদন করা হয় সনাতন পদ্ধতিতে। এসব ঘেরে চিংড়ির যে কয়টি সমস্যা খুব বেশি দেখা যায় তার মধ্যে চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমা অন্যতম। এতে চিংড়ির দেহের বাইরে, বিশেষ করে খোলসের উপরে বিভিন্ন অযাচিত অণুজীব, যেমনঃ প্রোটোজোয়া, ব্যাক্টেরিয়া, শৈবাল ও অতি ক্ষুদ্র জৈব কণিকা জমে থাকে। অনেক সময় এই অণুজীবগুলি চিংড়ির ফুলকায় জমা হয়ে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে, এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিংড়ি মারা যায়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক এবং ব্যবহারিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা বা ময়লা জমা কোনও রোগ নয়, বরং এটি চাষ পদ্ধতির পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার একটি সরাসরি সূচক।

Shrimp fouling treat rez

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমার কারণ কি?

এই নিবন্ধে আপনি বিস্তারিতভাবে জানতে পারবেন যে মূলত কি কারণে বাগদা ও গলদা চিংড়ির খোলসে শেওলা বা ময়লা জমে !

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমা সমস্যার লক্ষণসমূহ:

খোলসে শ্যাওলা জমা সমস্যায় আক্রান্ত চিংড়ি নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখে সহজেই সনাক্ত করা যায়:

  • চিংড়ির দেহের উপরিভাগে (খোলস) বাদামী/সবুজ/কালো আস্তরণ পড়া
  • উপাঙ্গগুলোতে চুলের মতো বা তুলার মতো আস্তরণের বৃদ্ধি পাওয়া
  • আক্রান্ত চিংড়ির ফুলকায় কালচে বর্ণের তুলার মত আবরণ তৈরি হয় যা ফুলকাকে অবরুদ্ধ করে ফেলে
  • খাদ্য গ্রহণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়া এবং দৈহিক বৃদ্ধি মন্থর হওয়া
  • ঘন ঘন পানির উপরিভাগে ভেসে ওঠা (অক্সিজেনের স্বল্পতাজনিত চাপ) ও ঘেরের কিনারায় চলে আসা
  • দেরিতে বা অসম্পূর্ণ খোলস পরিবর্তন

তীব্র সংক্রমণের ফলে হাইপোক্সিয়া (অক্সিজেন অভাব) এবং গৌণ সংক্রমণের কারণে ব্যাপক মৃত্যু ঘটতে পারে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা:

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা জমা সমস্যার প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক কৌশল হলো ঘেরে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমানো:

  • চিংড়িকে অতিরিক্ত সম্পূরক পিলেট খাদ্য দেওয়া বন্ধ করুন
  • খাদ্য প্রদানের হার পুনঃনির্ধারণ ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য ফিডিং ট্রে (খাদ্য দেয়ার পাত্র) ব্যবহার করুন
  • খাদ্যের অব্যবহৃত অবশিষ্টাংশ অপসারণ করার সুযোগ থাকলে তা অপসারণ করুন
  • নিয়মিত কালো কাদা বা বর্জ্য (sludge) সাইফনিং করে তলদেশ থেকে অপসারণ করুন
  • শ্রিম্প টয়লেট না থাকলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও মাটিতে ব্যবহার্য প্রোবায়োটিক ব্যবহার করুন

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের অন্যতম প্রধান প্রতিরোধমূলক কৌশল হল পানির বিভিন্ন প্যারামিটার এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা:

  • দ্রবীভূত অক্সিজেন(Dissolved Oxygen): > ৫ মিলিগ্রাম/লিটার
  • পিএইচ (pH): ৭.৫-৮.৫
  • অ্যামোনিয়া(Ammonia): < ০.৫ মিলিগ্রাম/লিটার
  • নাইট্রাইট(Nitrite): < ০.৫ মিলিগ্রাম/লিটার
  • অ্যালকালিনিটি (Alkalinity): ১৫০-১৮০ মিলিগ্রাম/লিটার (ক্যালসিয়াম কার্বোনেট হিসেবে)
  • হার্ডননেস (Hardness): ৮০-১২০ মিলিগ্রাম/লিটার (ক্যালসিয়াম কার্বোনেট হিসেবে)

প্রোবায়োটিক নির্ভর ব্যবস্থাপনা আধুনিক খামারগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে:

  • ব্যাসিলস(Bacillus spp.) প্রজাতির প্রোবায়োটিক (উপকারী অণুজীব) যা ঘেরের তলদেশের অরগানিক লোডযুক্ত কাঁদাকে পরিশোধনের মাধ্যমে চিংড়ির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে
  • নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে যাতে পানির অ্যামোনিয়া গ্যাস দ্রুত তুলনামূলক কম ক্ষতিকর নাইট্রেট এ রূপান্তরিত হতে পারে
  • ঘেরে প্রতি ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পরপর চিটাগুড় বা গমের আটা দিতে হবে

মজুদ ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ:

আপনি যদি আপনার ঘেরে উচ্চ ঘনত্বে চিংড়ি মজুদ করেন তাহলে জৈব লোড এবং স্ট্রেস বেড়ে যাবে, যা বিভিন্ন রোগ-বালাই এবং চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা হওয়াকে উৎসাহিত করবে। তুলনমূলক কম ঘনত্বে মজুদ করতে হবে।

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা বা ময়লা জমার জৈব প্রতিকারঃ

  • প্রাথমিকভাবে ২০-৩০% পানি পরিবর্তন করুন, এটি জৈব লোড এবং অণুজীবের ঘনত্ব কমায়
  • তলদেশের কাদা বা বর্জ্য যতটা সম্ভব অপসারণ
  • অ্যারেশন বাড়ানো
  • প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রোবায়োটিক প্রয়োগ

চিংড়ির খোলসে শ্যাওলা বা ময়লা জমার রাসায়নিক প্রতিকারঃ

  • প্রতি শতকে ৫ মিলি হারে (৪-৫ ফুট গভীরতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) বেনজাল কোনিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার্য, এটি প্রোটোজোয়া এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর
  • জীবাণুনাশক হিসেবে হাইড্রোজেন পারক্সাইড (H₂O₂) ব্যবহার করা যেতে পারে যা অত্যন্ত কার্যকরী
  • প্রতি শতকে ২৫০ – ৩০০ গ্রাম হারে কৃষি চুন বা ডলোমাইট ব্যবহার্য
  • চিংড়ির অসমোটিক চাপ কমাতে, প্রোটোজোয়ান ফাউলিং নিয়ন্ত্রণে ও জীবাণু দমনে, প্রতি শতকে ৩০০-৫০০ গ্রাম হারে লবণ প্রয়োগ করতে হবে
  • চিংড়ির খোলস দ্রুত পরিবর্তনের জন্য মানসম্মত মিনারেলস ব্যবহার করুন
প্রদীপ কুমার দাম
প্রদীপ কুমার দাম

মৎস্যবিদ প্রদীপ কুমার দাম, একজন একুয়াকালচার এক্সপার্ট। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন থেকে ফিসারিজ বিষয়ে বিএসসি (সম্মান) এবং ফিস জেনেটিক্স এন্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার প্রায় ১২ বছরের অধিক সময় ধরে মৎস্য সেক্টরের বিভিন্ন পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক/সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার পদে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ এ কর্মরত আছেন।