বাংলাদেশে মাছ ও চিংড়ি চাষে দীর্ঘদিন যাবত জিওলাইট ব্যবহৃত হচ্ছে, যার শতভাগ আমদানি করা হয় ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে। এদেশের বহু মাছ ও চিংড়ি খামারি বিভিন্ন ফিস মেডিসিন কোম্পানির কর্তৃক আমদানিকৃত নানান ব্রান্ডের জিওলাইট বাজার থেকে সংগ্রহ করে তাদের ঘের/পুকুরে প্রয়োগ করে থাকে। তারা মুলত তাদের চাষ পুকুর/ঘেরের তীব্র অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রকোপ এবং পানির পিএইচ (pH) এর তারতম্য দূর করতে জিওলাইট ব্যবহার করে থাকে। তবে চিন্তার বিষয় হল, বেশিরভাগ খামারিই জানেনা এই পণ্য ব্যবহারে তাদের আসলেই কোন উপকার হচ্ছে কি না!

একারনে আমরা আজ এই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে নিস্পত্তি করার চেষ্টা করবো যে আসলে মাছ ও চিংড়ি চাষে জিওলাইট ঠিক কতটা কাজে আসছে।
আমেরিকার বিখ্যাত Auburn University এর এমিরেটাস অধ্যাপক Claude E. Boyd, তার প্রকাশিত এক বিজ্ঞান প্রকাশনায় ৫০ এরও বেশি রকমের প্রাকৃতিক ও বহু কৃত্তিম জিওলাইটের কথা উল্লেখ করেছেন।
জিওলাইট হল প্রাকৃতিক বা কৃত্তিম উপায়ে তৈরি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত এলুমিনো-সিলিকেট খনিজ। “জিওলাইট” শব্দটি দুইটি গ্রিক শব্দ ‘Zeo’ অর্থ “ফুটন্ত” এবং ‘Lithos’ অর্থ “পাথর” থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো “ফুটন্ত পাথর”। ১৭৫৬ সালে সুইডিশ খনিজবিদ এক্সেল ফ্রেডরিক ক্রনস্টেড সর্বপ্রথম জিওলাইট আবিষ্কার করেন।
জিওলাইটের ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি (CEC) ও অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺) আয়ন শোষণের প্রবল ক্ষমতা, মাছ বা চিংড়ি চাষে এর ব্যপক জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ। ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি (CEC) হল, এর আণবিক কাঠামোর ভেতরে ধনাত্মক চার্জযুক্ত আয়ন বা ক্যাটায়ন (যেমন: সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, অ্যামোনিয়াম ইত্যাদি) ধরে রাখার এবং অন্য আয়নের সাথে তা বিনিময় করার ক্ষমতা। সহজ ভাবে বললে, জিওলাইটের গায়ে ঋণাত্মক (-) চার্জ থাকে, যা প্রয়োজনীয় ক্যাটায়নগুলোকে (ধনাত্মক চার্জযুক্ত আয়ন) চুম্বকের মতো টেনে আটকে রাখতে পারে। প্রাকৃতিক জিওলাইটের ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি সাধারণত ৬০ থেকে ২৩০ meq/100g হয়। তবে সিন্থেটিক জিওলাইটের ক্ষেত্রে এই মান সাধারণত ৩০০-৯০০ meq/100g পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মাছ ও চিংড়ি চাষে জিওলাইট ব্যবহার কি লাভজনক?
- জিওলাইট মূলত তার ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি (CEC) ব্যবহারের মাধ্যমে পানির অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺) আয়নকে নিজের দিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রের ভিতর আটকে ফেলে।
- অন্যদিকে জিওলাইটের ধনাত্মক আয়ন, বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম আয়ন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ফলে পানির হার্ডনেস কমে যায়। যা চিংড়ি চাষে ব্যাপক খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
- এটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺) শোষণ করে সাময়িকভাবে (যদিও এর এয়ার পকেট পূর্ণ হলে পুনরায় আবার NH₄⁺ পানিতে ফিরিয়ে দেয় )কিন্তু বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস (NH₃) এবং নাইট্রাইট (NO₂⁻) সরাসরি কমায় না।
- পানিতে মূলত অ্যামোনিয়া দুইটি ফরমে থাকে ১) অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺) – কম ক্ষতিকর ও ২) অ্যামোনিয়া গ্যাস (NH₃) ক্ষতিকর। এই দুই ঘটনার অ্যামোনিয়াকে একসাথে বলে TAN(Total Ammonia Nitrogen).
- তাই আমরা যখন কোন অ্যামোনিয়া টেস্ট কিট ব্যবহার করে অ্যামোনিয়া পরীক্ষা করি তখন কিন্তু যে রেজাল্ট পাই সেটা কিন্তু এই TAN। অর্থাৎ আলাদা ভাবে আপনি কখনই জানতে পড়ছেন না যে, আসলে আপনার পুকুরে বর্তমানে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ কত?
- অন্যদিকে, অ্যামোনিয়া নাইট্রিফিকেশনের মাধ্যমে প্রথম ধাপে যে নাইট্রাইট (NO₂⁻) এ রুপান্তরিত হয় সেটাও মাছ ও চিংড়ি উভয়ের জন্যই ভয়ঙ্কর! পানিতে কিন্তু এই প্রক্রিয়া চলমান থাকে! এটা কি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা এর মতো নয়?
- তার মনে আপনি নরমাল অ্যামোনিয়া টেস্ট কিটের মাধ্যমে এই নাইট্রাইট (NO₂⁻) কে ধরতেই পারবেন না! তাই আপনার প্রথাগত টেস্ট কিটে অ্যামোনিয়া এর মান শূন্য দেখালেও আসলে আপনি কি ঝুঁকি মুক্ত? মোটেও না! গোপনে এই নাইট্রাইট আপনার মাছ/চিংড়ির ক্ষতি করছে!
- এখন বলুন জিওলাইট যদি শুধু কম ক্ষতিকর অ্যামোনিয়ামই সাময়িকভাবে কমায় তাহলে আপনার কি কোনও লাভ হবে? হবে না।
- আরও আছে :-
- লবণাক্ত/মৃদু লবণাক্ত পানিতে জিওলাইটের কার্যকারিতা অনেক কমে যায়। ফলে এটা পানির গুণগত মান উন্নত করা এবং পানির গ্যাস দূর করার ক্ষমতা হারায়!
- উচ্চ pH ও তাপমাত্রায়ও জিওলাইটের কার্যকারিতা অনেক কমে যায়। তাই ভেবেচিন্তে ব্যবহার করুন!




